বাংলাগেজেট রিপোর্ট : কোটি মানুষের অশ্রু ও গুমরানো কান্নায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজা শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। জানাজা শেষে চন্দ্রিমা উদ্যানে স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে চিরন্দ্রিায় শায়িত হন খালেদা জিয়া। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে খালেদা জিয়া ছিলেন গভীর আবেগ ও ইতিহাসের নাম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজারো মানুষ শীত উপেক্ষা করে জানাজায় অংশ নিতে ছুটে আসেন। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ লোকসমাগমের সাক্ষী রইল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ। খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে লাখো মানুষের ঢল নামে জাতীয় সংসদ ভবনের আশপাশজুড়ে। কেউ কেউ এই জানাজাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানাজা বলে অভিহিত করেছেন।
খালেদার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় অভূতপূর্ব কূটনৈতিক উপস্থিতি দেখা গেছে। বুধবার দুপুর ২টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় জানাজায় অন্তত ৩২টি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কূটনীতিক অংশগ্রহণ করেন। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত মেগান বোল্ডিন, ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং, অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল, সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেতো সিগফ্রিড রেংলি, চীন, রাশিয়া, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক। এছাড়া নেদারল্যান্ডস, ইতালি, সুইডেন, স্পেন, নরওয়ে, ব্রাজিল, ইরান, কাতার, ডেনমার্ক ও মালয়েশিয়ার শীর্ষ কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। কূটনীতিকদের পাশাপাশি বিমসটেকের মহাসচিব ইন্দ্র মনি পান্ডে এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ সিমোন লসন পার্চমেন্টও জানাজায় অংশ নেন। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বজায় রেখে তারা জানাজাস্থলে পৌঁছান। বিশ্লেষকদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক কূটনীতিকের উপস্থিতি খালেদা জিয়ার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাবের প্রতিফলন।
খালেদা জিয়ার জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, উপদেষ্টা পরিষদ সদস্যবৃন্দ, জামায়াতের আমির ড. শফিকুর রহমান, তিনবাহিনী প্রধান ছাড়াও লাখো মানুষ অংশ নেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজাস্থলে উপস্থিত হয়ে সবার কাছে মায়ের জন্য দোয়া চান তার ছেলে তারেক রহমান। জানাজায় উপস্থিত বিপুল মানুষের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, আপনারা আমার মরহুমা মায়ের জন্য দোয়া করবেন। করো কাছে আম্মার কোনো ঋণ থাকলে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন। আমি পরিশোধ করব। কেউ আমার মায়ের আচরণে বা কথায় কষ্ট পেয়ে থাকলে তার পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রার্থী। সবাই তার জন্য দোয়া করবেন।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ শোক ও জনসমাগমে স্তব্ধ হয়ে উঠে, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ শীত উপেক্ষা করে যোগ দেন। ভোর থেকেই শোকাহত মানুষের স্রোতে জনসমুদ্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা। খালেদা জিয়ার জানাজায় কত মানুষ উপস্থিত এই প্রশ্নের কোনো পরিমাপযোগ্য উত্তর নেই। উপস্থিত জনতার ভাষায় একটাই শব্দ কোটি মানুষ অংশ নিয়েছে। ঢাকা মহানগরী ছাড়া আশপাশের জেলা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন প্রিয় নেত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে। খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ঢাকায় আগমন করেন। সফরকালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে ভারতের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা পৌঁছে দেন। খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণ ও শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিকও ঢাকায় পৌঁছেছেন। তাঁর এই উপস্থিতিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে সৌজন্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিদেশি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের এই অংশগ্রহণ খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে।



